মফস্বল সাংবাদিকতায় আজও যে কারনে প্রাসঙ্গিক মুনির হোসেন

নভেম্বর ২৫ ২০২০, ০৬:১৬

সৈয়দ মেহেদী হাসান॥ অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলা ভাষায় সংবাদপত্রের সূচনা হলেও বরিশালে সেই যাত্রা জনপ্রিয় হয় এক শতাব্দী পরে। সংবাদপত্রের যাত্রাপথে অসংখ্য নামি-দামী সাংবাদিক তাদের কর্মকান্ডে ভাস্বর হয়ে রয়েছেন। মফস্বল সাংবাদিকতায় দিক নির্নয় এবং অবদান রেখে গেছেন।

মুনির হোসেন তেমনি এক নাম। গ্রামের মাটির গন্ধ, উপকূল, গ্রামীণ জীবনযুদ্ধ, সংকট, সংঘাত দেখতে দেখতে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি তার আদর্শ এবং লাইফস্টাইল দিয়ে একযুগ পড়েও ‘আইকন’ হয়ে আছেন। গণমাধ্যমকর্মীদের আড্ডা কিংবা প্রবীণ নাগরিকদের স্মৃতিচারণায় মিডিয়া জগতের যে দু’ চারজনের নাম আজও আলোচিত হয় তাদের মধ্যে একজন মুনির হোসেন। আজ তার ১৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী।

না ফেরার দেশে চলে যাওয়া এই মানুষটি এখনো কেন প্রাসঙ্গিক? এমন প্রশ্ন প্রায়শই করি।

আজও যারা বরিশাল মিডিয়ায় সুস্থ ধারা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন, যে সমস্ত শ্রদ্ধাভাজন সিনিয়র সাংবাদিক সাংবাদিকতায় তেল-মসলা মেখে পেশাটাকে বিক্রি করছেন না; তাদের আলোচনায় কান পাতলেই শোনা যায়, ‘মুনির হোসেনের জীবনীটা পাড়লে জেনে নিও।’

সঙ্গত কারনেই জানতে মনে চায়, আসলেই কি আছে তার জীবদ্দশায়? তার সহকর্মী, আত্মীয়-স্বজনের সাথে আলাপ করে যতদূর জেনেছি, তাতে আজকাল আমি/আমরা যে সাংবাদিকতা করছি এটিকে সাংবাদিকতা বলা চলে না। কারন আমরা সাংবাদিকতায় এসে এখন সমাজের হৃদস্পন্দন হতে পারি না। হয়ে উঠি মানুষের কাছে আতংক। কিন্তু সাংবাদিকতা কি আতংকের ভিন্নরূপ হতে পারে? মোটেই না।

কারন মানুষের সুখ, দুঃখ, সমস্যা ও সম্ভাবনা তুলে ধরে জনতার আদালতে সোপর্দ করার উপনাম সাংবাদিকতা। আর আমরা যা করছি তা হলো দেশ-জাতির স্বার্থের চেয়ে সাংবাদিক নামের পবিত্র পেশাটাকে লুন্ঠিত করছি। এখানেই ব্যাতিক্রম মরহুম মুনির হোসেন। একটি উদাহরণ দিতে চাই, সাংবাদিক মুনির হোসেনের মারা যাওয়ার পর তার ব্যাংক একাউন্টে একটি টাকাও গচ্ছিত পাওয়া যায়নি। এমনকি তার ব্যাংক একাউন্টও ছিল না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার পরও কিন্তু তার ব্যাংক একাউন্টে উল্লেখযোগ্য কোন টাকা পাওয়া যায়নি। আমি কারও সাথে কারও তুলনা করছি না।

তবে স্পষ্ট করতে চাচ্ছি, সৎ মানুষের কৃতকর্ম প্রায় একই হয়। যারা নিজের পেশাকে বেইজ্জতি করে টাকা-কঁড়ি কামান না তাদের জন্য মানুষের হৃদয় থাকে উৎসর্গকৃত। সচারচার এমন আদর্শের কলম সৈনিক খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। কিন্তু মুনির হোসেন তার জীবদ্দশায় সাংবাদিক হিসেবে সাধারণের হৃদস্পন্দন হতে পেরেছিলেন। কেউ কেউ হয়তো বলতে চেষ্টা করবেন ব্যাংকে টাকা জমাতে না পারাটা তার ব্যর্থতা। কিন্তু আমি বলবো, এই উদাহরণ মুনির হোসেনের সফলতার উদাহরণ। সব পেশা টাকায় কনভার্ট করা যায় না। তেমনি একটি উদারনৈতিক পেশা হলো সাংবাদিকতা। এখানে যিনি নীতির সাথে আপোসহীন থাকেন তিনি যুগে যুগে মুনির হোসেন হয়ে উঠেন। কিন্তু যারা পেশাটাকে বিক্রি করে, মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে সাংবাদিক ট্যাগ লাইনে নিজের ধান্ধা করেন তারা হয়তো একটি নয়, শতাধিকও ব্যাংক একাউন্ট ও তাতে কোটি টাকা গচ্ছিত রেখে যেতে পারেন; কিন্তু মুনির হোসেনের মত সম্মানিত হতে পারবেন বলে সংশয় রয়েছে।

মানুষ মারা গেলে শরীরে পঁচন ধরার আগে তার কৃতকর্মের সুনাম-দুর্নাম ছড়িয়ে যায়। যেহেতু মৃত্যুর ১৪ বছর পর আজও মুনির হোসেন তার নামের সুনাম ছড়িয়ে যাচ্ছেন; সঙ্গত কারনেই তাকে নিয়ে আলোচনা হতে পারে। গবেষণা হতে পারে। এতে করে মফস্বল সাংবাদিকতা উপকৃত হবে।

নতুন প্রজন্ম যারা সাংবাদিকতায় আসছেন তারা শিখবেন; পেশার পবিত্রতা রক্ষা করতে উদ্বুদ্ধ হবেন। শুধু বছর বছর স্মরণ সভায় সীমাবদ্ধ করে নয়, তার জীবনী লিপিবদ্ধকরণ, প্রকাশিত সংবাদের বৈশিষ্ট্য এবং সংবাদ মান নিয়ে গবেষণা পত্র প্রকাশ করে তা প্রচারের উদ্যোগ নিতে হবে। এটি এখন সময়ের দাবী। আর তার জন্য এগিয়ে আসতে হবে গণমাধ্যমকর্মীদেরই।

মুনির হোসেন যে শুধু সাংবাদিকতায় সততার পরিচয় দিয়ে গেছেন তা কিন্তু নয়, তিনি জাতীয়তা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অটল ছিলেন।

আজীবন লড়াউ করে গেছেন কুপমন্ডুকতার বিরুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, চেতনা নিয়ে গেছেন অজপাড়াগায়েও। তিনি যে সময়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সভাপতি ছিলেন তখন সত্যিকার অর্থেই স্বাদীনতা বিরোধীদের চাপে সংস্কৃতি চর্চা করা ছিল দূরুহ। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলা ছিল দুস্কর। কিন্তু সেই প্রভাব কাটিয়ে বারবার নেতৃত্ব দিয়েছেন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে। মানুষকে নির্ভয়ে নামিয়ে এনেছেন সংস্কৃতি চর্চা, মৃক্তিযুদ্ধের চেতায় উদ্বুদ্ধ করে।

বরিশাল অঞ্চলের মানুষের জীবনমান বদলাতে তিনি হাতে তুলে নিয়েছিলেন কলমী সঞ্জিবন, বাঙালীয়ানা ছড়িয়ে দিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে, মৃক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিতে মাঠে নেমেছেন রাজনৈতিক দল নিয়ে। এক জীবনে এর থেকে লড়াই করার আর কোন পথ হয়তো থাকতে পারে না।

তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আদর্শ, নৈতিকতা এবং সততার সাথে লড়াই করে গেছেন। যে কারনেই আজও প্রাসঙ্গিক মরহুম মুনির হোসেন। মৃত্যুদিবসের এই দিনে তাকে স্মরণ করছি অকত্রিম চিত্তে। নগন্য গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে মনে ধারণ করছি, মুনির হোসেনের সততা যেন আমিও ধারণ করতে পারি। ব্যাংক ব্যালেন্স নয়, দেশ-জাতির কল্যানে কাজ করা হোকে আমাদের সাংবাদিকতার মূলমন্ত্র।